বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার ১০ শতাংশের নিচে থমকে আছে

বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে উদ্বেগের পাহাড় জমলেও বাস্তবে এর রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।

কয়েক বছর ধরেই বার্ষিক প্লাস্টিক উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশের কম অংশ সফলভাবে রিসাইক্লিং করা হচ্ছে। অবশিষ্ট বিশাল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য হয় পুড়িয়ে ফেলা হয়, না হয় ভাগাড়ে (ল্যান্ডফিল) স্তূপ করে রাখা হয় বলে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে নিক্কেই এশিয়া।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রোকেমিক্যাল থেকে তৈরি এ উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি বাস্তুসংস্থান ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) এক বৈঠকে ওশেনিয়া অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র পালাউয়ের প্রেসিডেন্ট সুরঞ্জেল হুইপস জুনিয়র গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণের বর্তমান ফলাফল আমাদের মানুষ ও পৃথিবীর প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।’

প্রায় ৪০টি দেশের জোট ‘অ্যালায়েন্স অফ স্মল আইল্যান্ড স্টেটস’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্লাস্টিক দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সাল থেকে প্লাস্টিকের উৎপাদন থেকে শুরু করে বর্জন পর্যন্ত পুরো জীবনচক্র নিয়ন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করার চেষ্টা করছে ইউএনইপি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ঐকমত্যে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। সমুদ্রের প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে বিপর্যস্ত দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কঠোর বিধিনিষেধের পক্ষে দাঁড়ালেও তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে এ প্রস্তাব।

জাপানের তোকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এইজি হোসোদা বলেন, প্লাস্টিকের ব্যবহার একেক দেশের সংস্কৃতি, প্রথা ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন হয়, তাই এর নিয়ন্ত্রণে অভিন্ন নিয়ম কার্যকর করা বেশ কঠিন।

রিসাইক্লিংয়ের বদলে প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানো হলে তা থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে নদী বা সমুদ্রে প্লাস্টিক ভেঙে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর দেহে জমা হয়। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এ বিষাক্ত কণা শেষ পর্যন্ত মানবদেহে প্রবেশ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক বর্জ্য মানবস্বাস্থ্য ও প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন প্লাস্টিক উৎপাদন কমানো এবং রিসাইক্লিং বাড়ানোই এ সংকট থেকে বাঁচার একমাত্র পথ।

তথ্য বলছে, প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদনে বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবের কিং আবদুল্লাহ পেট্রোলিয়াম স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৭ কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছে। অন্যদিকে দেশটিতে রিসাইক্লিং হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশাল ভূখণ্ডের সুবিধা নিয়ে দেশটি প্রায় ৭৩ শতাংশ বর্জ্য ল্যান্ডফিলে ফেলে রাখে।

চীনের তসিংহু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৩৮ কোটি ৭০ লাখ টন প্লাস্টিক উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩ কোটি ৮০ লাখ টন বা প্রায় ১০ শতাংশ রিসাইক্লিং করা হয়েছে।

প্লাস্টিক দূষণকারী হিসেবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ চীনে রিসাইক্লিং হার ১৩ শতাংশ এবং ইইউভুক্ত দেশে তা ১৪ শতাংশ। জাপানের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, জাপানে রিসাইক্লিং হার ২২ শতাংশ দেখা গেলেও এর প্রায় ৭০ শতাংশই মূলত পুড়িয়ে ফেলা হয়। জাপানে এটি ‘থার্মাল রিসাইক্লিং’ নামে পরিচিত। এ প্রক্রিয়ায় বর্জ্যকে নতুন করে প্লাস্টিকে রূপান্তর করা হয় না। বরং এসব বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং সে প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ থেকে বিদ্যুৎ বা শক্তি আহরণ করা হয়। এছাড়া দেশটিতে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদা করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, রিসাইক্লিং হার কম থাকার প্রধান কারণ এর উচ্চব্যয়। পুরনো প্লাস্টিক সংগ্রহ ও সংরক্ষণের খরচ এত বেশি যে তার তুলনায় নতুন প্লাস্টিকের উপাদান বা ‘ভার্জিন ম্যাটেরিয়াল’ অনেক সস্তা। ফলস্বরূপ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো রিসাইক্লিং করা প্লাস্টিক ব্যবহারে উৎসাহ পায় না।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) সতর্ক করেছে যে বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ বাস্তুসংস্থানে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রবাহ ২০২০ সালের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। নতুন কোনো পদক্ষেপ না নেয়া হলে প্রকৃতিতে প্লাস্টিকের পরিমাণ আগামী ২০ বছরে অন্তত ১৪ শতাংশ বাড়বে।

তবে উন্নত দেশগুলো এখন প্লাস্টিক পুনরুৎপাদন বাড়াতে কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। ইইউর নতুন নীতি অনুযায়ী, নতুন গাড়িতে অন্তত ১৫ শতাংশ রিসাইকেল করা প্লাস্টিক ব্যবহার করতে হবে নির্মাতাদের, যা পরবর্তী ১০ বছরে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হতে পারে।

ওইসিডির মতে, বিশ্বের সব দেশ সমন্বিতভাবে কাজ করলে প্রকৃতিতে প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং তেল ও প্লাস্টিক উৎপাদনকারী গোষ্ঠীগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পৃথিবীর কথা ভাবা।

আরও